কওমী মাদরাসার সংক্ষিপ্ত ইতিহাস

deobond

‘কওমী মাদরাসা’ আমাদের সমাজের এক বিশেষ ধরণের ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। ভারতের উত্তর প্রদেশে অবস্থিত ঐতিহাসিক ‘দারুল উলূম দেওবন্দ মাদরাসা’র মাধ্যমেই মূলত এই কওমী ধারার শিক্ষাব্যবস্থার প্রচলন শুরু হয়। পরবর্তী সময়ে এই দেওবন্দ মাদরাসার অনুকরণে ভারতীয় উপমহাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে অসংখ্য কওমী মাদরাসা।

‘কওমী’ নামের পেছনের আসল রহস্য

অনেকের মনেই প্রশ্ন জাগতে পারে, এই ধারার মাদরাসাগুলোকে ‘কওমী’ কেন বলা হয়? আসলে ‘কওমী’ শব্দের অর্থ জাতীয়, আর ‘মাদরাসা’ শব্দের অর্থ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। অর্থাৎ, শব্দগত অর্থে ‘কওমী মাদরাসা’ মানে হলো জাতীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। যেহেতু এই ধারার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো কোনো সরকারি অনুদানের তোয়াক্কা না করে সরাসরি মুসলিম কওমের (জাতির) সাধারণ মানুষের সাহায্য ও ভালোবাসার দানে পরিচালিত হয়, তাই এগুলোকে ‘কওমী মাদরাসা’ বলা হয়ে থাকে।

একটা সময় কওমী মাদরাসাগুলোকে ‘খারেজী মাদরাসা’ও বলা হতো। ‘খারেজী’ শব্দের অর্থ বহির্ভূত। যেহেতু এই মাদরাসাগুলো সম্পূর্ণভাবে সরকারি নিয়ন্ত্রণ ও প্রভাবের বাইরে ছিল, তাই সাধারণ মানুষ একে খারেজী মাদরাসা বলত। এছাড়া দারুল উলূম দেওবন্দের আদর্শ ও অনুকরণে পরিচালিত হওয়ার কারণে অনেক স্থানে একে ‘দেওবন্দী মাদরাসা’ বা ‘দারুল উলূম মাদরাসা’ নামেও ডাকা হয়।

১৮৬৬ সাল: উপমহাদেশের এক চরম ক্রান্তিকাল

১৮৬৬ সালে দারুল উলূম দেওবন্দ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। এটিই ছিল কওমী ধারার ইতিহাসের প্রথম শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। তবে এই মাদরাসাটি এমন এক সময়ে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল, যখন ভারতীয় উপমহাদেশের মুসলমানরা তাদের ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছিল। পলাশীর যুদ্ধে মীর জাফরের বিশ্বাসঘাতকতার পর, ইংরেজরা এক এক করে এদেশের সব রাজ্যের স্বাধীনতা ছিনিয়ে নিচ্ছিল এবং পুরো উপমহাদেশকে জিম্মি করে ফেলেছিল।

কওমী-মাদরাসা১
ভারতবর্ষের মানচিত্র। বামের মানচিত্রটি ১৭৬৫ সালের এবং ডানের মানচিত্রটি ১৮০৫ সালের। ইংরেজদের দখলকৃত রাজ্যগুলোকে হালকা গোলাপি রং দ্বারা চিহ্নিত করা হয়েছে। – ছবিঃ উইকিপিডিয়া।

 

কওমি-মাদরাসা২
ভারতবর্ষের মানচিত্র। বামের মানচিত্রটি ১৮৩৭ সালের এবং ডানের মানচিত্রটি ১৮৫৭ সালের। ইংরেজদের দখলকৃত রাজ্যগুলোকে হালকা গোলাপি রং দ্বারা চিহ্নিত করা হয়েছে। ছবিঃ উইকিপিডিয়া।

১৮০৩ সালের মধ্যে দিল্লির শাসনক্ষমতাও চলে যায় ইংরেজদের পকেটে। তখন দিল্লির প্রশাসনিক কেন্দ্র থেকে এক দাম্ভিক ঘোষণা দেওয়া হয়:

“এখন থেকে ভারতের প্রশাসনিক নীতি হবে—সৃষ্টি আল্লাহর, সাম্রাজ্য সম্রাটের, আর হুকুম চলবে কোম্পানির!”

এই ঘোষণার পর দিল্লির বিখ্যাত হাদিস শিক্ষা কেন্দ্র থেকে সেই যুগের শ্রেষ্ঠ আলেম শাহ আব্দুল আজীজ দেহলভী (রহ.) এক ঐতিহাসিক ফতোয়া জারি করেন। তিনি ঘোষণা করেন—“এখন থেকে ভারত ‘দারুল হরব’ (শত্রু কবলিত এলাকা)। আর এই দেশকে শত্রুমুক্ত করার জন্য লড়াই করা প্রতিটি মুসলমানের ওপর ফরজ।”

উল্লেখ্য, শাহ আব্দুল আজীজ (রহ.) ছিলেন জগদ্বিখ্যাত আলেম ও সংস্কারক হযরত শাহ ওয়ালিউল্লাহ মুহাদ্দিসে দেহলভী (রহ.)-এর সন্তান। সমাজে তাঁর ব্যাপক প্রভাব থাকার কারণে এই ফতোয়া দ্রুত সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে এবং মুসলমানদের মনে দেশের স্বাধীনতা ফিরিয়ে আনার তীব্র আকাঙ্ক্ষা জাগিয়ে তোলে।

বালাকোটের প্রান্তর থেকে সিপাহী বিদ্রোহ

শাহ আব্দুল আজীজ (রহ.)-এর যোগ্য শিষ্য ও খলিফা ছিলেন হযরত সাইয়্যিদ আহমদ শহীদ বেরলভী (রহ.)। দেশ থেকে ইংরেজদের বিতাড়িত করার লক্ষ্যে তিনি একটি মুজাহিদ বাহিনী গঠন করেন। এই বাহিনীতে তাঁর সহযোগী হিসেবে যোগ দেন শাহ আব্দুল আজীজ (রহ.)-এর জামাতা মাওলানা আব্দুল হাই (রহ.) এবং ভাতিজা শাহ ইসমাইল শহীদ (রহ.)।

অসংখ্য ওলামা ও ধর্মপ্রাণ সাধারণ মানুষ এই বাহিনীতে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়াই করেন। প্রায় অর্ধ যুগ যুদ্ধের পর, ১৮৩১ সালে বালাকোটের প্রান্তরে শিখ ও ইংরেজদের যৌথ বাহিনীর সাথে মুজাহিদদের তুমুল লড়াই হয়। এই যুদ্ধে সাইয়্যিদ আহমদ বেরলভী ও শাহ ইসমাইল শহীদ (রহ.) সহ অসংখ্য আলেম শাহাদাত বরণ করেন। সাময়িকভাবে মুজাহিদ বাহিনী থমকে গেলেও আলেমদের মন থেকে স্বাধীনতার স্বপ্ন মুছে যায়নি। এর প্রমাণ মেলে ১৮৫৭ সালের সিপাহী বিদ্রোহে।

বালাকোট
বালাকোট শহরের সন্ধ্যাকালীন দৃশ্য।
ছবি: উযাইর ওয়ালী মুহাম্মাদ। সোর্স: উইকিপিডিয়া
বালাকোটে শাহ্‌ ইসমাইল শহীদ রহ.-এর কবর। -ছবিঃ উইকিমিডিয়া।

১৮৫৭ সালের এই মহা বিদ্রোহে উপমহাদেশের স্বাধীনতাকামী আলেম ও জনতা সিপাহীদের সাথে একাত্ম হয়ে যান। ইংরেজরা যখন সিপাহীদের এমন এক নতুন টোটা ব্যবহার করতে বাধ্য করে, যাতে গরু ও শুকরের চর্বি মাখানো ছিল এবং যা দাঁত দিয়ে কাটতে হতো, তখন মুসলিম ও হিন্দু সিপাহীরা ধর্ম রক্ষার্থে বিদ্রোহ ঘোষণা করে।

এই বিদ্রোহে ওলামায়ে কেরাম শামেলির ময়দানে ইংরেজদের এক বিশাল বাহিনীকে পরাজিত করেন এবং থানাভবনকে কেন্দ্র করে একটি ‘স্বাধীন এলাকা’ ও ‘অস্থায়ী সরকার’ ঘোষণা করেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত নানাবিধ কারণে এই বিদ্রোহ ব্যর্থ হয়। আর এরপরই মুসলমানদের ওপর নেমে আসে ইংরেজদের নির্মম নির্যাতনের স্টিম রোলার। প্রায় অর্ধ লক্ষ আলেমকে ফাঁসি দিয়ে হত্যা করা হয় এবং মানুষের মনে ভয় ঢোকানোর জন্য তাঁদের লাশ রাস্তার পাশের গাছের ডালে ঝুলিয়ে রাখা হয়।

সিপাহী বিদ্রোহ
১৮৫৭ সালে ইংরেজদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করার অপরাধে দু’জনকে ফাঁসি দেওয়া হছে। -ছবিঃ উইকিপিডিয়া।

মুসলিম শিক্ষাব্যবস্থা ধ্বংসের চক্রান্ত

ইংরেজরা খুব ভালো করেই জানত যে, তাদের মূল শত্রু হলো মুসলমানরা। কারণ তারা মুসলমানদের কাছ থেকেই ক্ষমতা কেড়ে নিয়েছিল। মুসলমানরা সামাজিকভাবে শক্তিশালী থাকার মূল কারণ ছিল তাদের মাদরাসাকেন্দিক শিক্ষাব্যবস্থা। ইংরেজদের আসার আগে এ দেশে মাদরাসার শিক্ষার্থীরাই বিচার ও রাজদরবারের প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করত।

madrasa
চতুর্দশ শতকে তৈরি একটি প্রাচীন মাদরাসা। এখানেই শায়িত আছেন মাদরাসাটির প্রতিষ্ঠাতা দিল্লির সুলতান আলাউদ্দীন খিলজি

কিন্তু ইংরেজরা এসে রাজদরবারের ভাষা ফার্সির বদলে ইংরেজি চালু করে এবং ইসলামী আইনের জায়গায় ব্রিটিশ আইন চাপিয়ে দেয়। ফলে রাতারাতি মাদরাসার ছাত্ররা বেকার হয়ে পড়েন। শুধু এটুকুই নয়, মাদরাসা পরিচালনার মূল উৎস ‘লাখেরাজ’ (করমুক্ত) জমিগুলো ইংরেজরা বাজেয়াপ্ত করে। অর্থাভাবে অসংখ্য মাদরাসা বন্ধ হয়ে যায় এবং সিপাহী বিদ্রোহের পর বাকি থাকা মাদরাসাগুলোকেও জোর করে সিলগালা করে দেওয়া হয়। এর পরিবর্তে তারা এমন এক শিক্ষাব্যবস্থা চালু করে, যার উদ্দেশ্য ছিল রক্তে-বর্ণে ভারতীয় হলেও মন-মানসিকতায় খাঁটি ইউরোপীয় ও খ্রিস্টান ভাবাপন্ন একদল সেবাদাস তৈরি করা।

সাত্তা মসজিদের ডালিম গাছ এবং এক নতুন সূর্যোদয়

হাজার হাজার আলেমের শাহাদাত এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ হয়ে যাওয়ার কারণে উপমহাদেশে দ্বীনি শিক্ষার এমন আকাল দেখা দিল যে, গ্রামের পর গ্রাম ঘুরেও জানাজার নামাজ পড়ানোর মতো কোনো মানুষ খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না। ওলামায়ে কেরাম আশঙ্কায় পড়লেন যে, এভাবে চললে মুসলমানরা তাদের ধর্মীয় পরিচয়ই হারিয়ে ফেলবে।

তখনকার দূরদর্শী আলেম হযরত কাসেম নানুতুবী (রহ.) ও তাঁর সহযোগীরা এক ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত নিলেন। তাঁরা চিন্তা করলেন, আপাতত সশস্ত্র স্বাধীনতার লড়াই স্থগিত রেখে ইসলামের আলো বাঁচিয়ে রাখার জন্য দ্বীনি শিক্ষার সংরক্ষণ ও প্রসারে মনোযোগ দিতে হবে।

হযরত কাসেম নানুতুবী (রহ.) যখন উত্তর প্রদেশের দেওবন্দের স্থানীয় সাত্তা মসজিদে যেতেন, তখন মসজিদের ইমাম হাজী আবেদ হুসাইন (রহ.)-এর কামরায় বসে স্থানীয় আলেমদের সাথে এই সংকট থেকে মুক্তির উপায় নিয়ে পরামর্শ করতেন। অবশেষে ১৮৬৬ সালের ৩০শে মে, সাত্তা মসজিদের বারান্দায় একটি ডালিম গাছের নিচে মাত্র একজন শিক্ষক (মোল্লা মাহমুদ রহ.) এবং একজন ছাত্র (মাহমুদুল হাসান রহ.)-কে নিয়ে শুরু হয় এক নতুন শিক্ষাধারা, যার নাম দেওয়া হয়েছিল ‘আরবী মাদরাসা’। এটিই আজকের বিশ্বখ্যাত ‘দারুল উলূম দেওবন্দ’।

satta mosjid
সাত্তা মসজিদের বাহিরের অংশের বর্তমান অবস্থা। ছবিঃ কামরুল ইসলাম।

উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া স্বাধীনতার চেতনা

কাসেম নানুতুবী (রহ.) শিক্ষাজীবনে যাদের সান্নিধ্য পেয়েছিলেন, তাঁরা ছিলেন শাহ আব্দুল আজীজ (রহ.)-এর ধারার মানুষ। ফলে উত্তরাধিকার সূত্রেই নানুতুবী (রহ.)-এর রক্তে মিশে ছিল স্বাধীনতার চেতনা। তিনি নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে দেওবন্দ মাদরাসাকে গড়ে তুলেছিলেন ঠিকই, কিন্তু এর আড়ালে এটি ছিল স্বাধীনতার চেতনা ছড়িয়ে দেওয়ার প্রধান কেন্দ্র।

দারুল কোরআন
দারুল উলূম দেওবন্দের হিফজখানা। দারুল কোরআন ভবন।
ছবি: কামরুল ইসলাম কাসেমী।

আর এই কেন্দ্র থেকেই পরবর্তীতে তৈরি হয়েছিলেন শাইখুল হিন্দ মাহমুদুল হাসান, হুসাইন আহমদ মাদানী, এবং মাওলানা ভাসানীর মতো উপমহাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের মহানায়কেরা। মাল্টার দ্বীপে বন্দি হয়েও যাঁরা ইংরেজদের সামনে মাথা নত করেননি এবং যাঁদের ত্যাগের ফলেই অবশেষে এই ভারতবর্ষ স্বাধীন হয়েছিল।

deoband

মূলত, দেওবন্দ মাদরাসা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য ছিল দুটি—ইসলামী শিক্ষার সংরক্ষণ ও প্রসার এবং দেশের স্বাধীনতার চেতনাকে বাঁচিয়ে রাখা। দেওবন্দ থেকে শিক্ষা শেষ করে ছাত্ররা সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েন এবং শত শত মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করেন। সেই দেওবন্দের অনুকরণে ও আদর্শে আমাদের বাংলাদেশে যে হাজার হাজার মাদরাসা গড়ে উঠেছে, সেগুলোকে আমরা ‘কওমী মাদরাসা’ নামে চিনি।

error: Content is protected !!