মানুষের দেহে যেমন নানারকম রোগ বা ব্যাধি হয়, ঠিক তেমনি রোগ হয় তার অন্তরেও। দেহের কোনো রোগ হলে আমরা খুব দ্রুত চিকিৎসকের কাছে যাই, ওষুধ খাই এবং সুস্থ হওয়ার জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করি। কিন্তু আফসোসের বিষয় হলো, অন্তরের মারাত্মক সব রোগ থেকে বেঁচে থাকার জন্য আমাদের তেমন কোনো প্রচেষ্টা বা আকুলতা চোখে পড়ে না।
অথচ দেহের রোগ হলে কোনো মোমিন যদি তাতে সবর (ধৈর্য) ধারণ করে, তবে আল্লাহ তায়ালা এর বিনিময়ে তার গুনাহগুলো ক্ষমা করে দেন। কিন্তু অন্তরের রোগ যদি দূর করা না যায়, তবে মানুষের দুনিয়া ও আখিরাত—উভয়টাই তিল তিল করে বরবাদ হয়ে যায়। অন্তরের রোগে আক্রান্ত মানুষ আকারে হয়তো মানুষই থাকে, কিন্তু প্রকারে বা স্বভাব-চরিত্রে সে আর প্রকৃত মানুষ থাকে না; সে যতই শিক্ষিত, অভিজাত বা ধনী হোক না কেন। তাই এই অন্তরের রোগগুলো দূর করে আখলাকে হাসানা বা উত্তম স্বভাব-চরিত্র অর্জনের মাধ্যমেই আমাদের প্রকৃত মানুষ হতে হবে।
আল্লাহ তায়ালার চাদর ও মানুষের অহংকার
অন্তরের যতগুলো মারাত্মক রোগ রয়েছে, তার মধ্যে অন্যতম বড় এবং ধ্বংসাত্মক একটি রোগ হলো ‘অহংকার’। এটি এত বড় ব্যাধি যে, এর থেকে বেঁচে থাকার জন্য কুরআন ও হাদিসে বারবার কঠোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। অহংকার বা বড়ত্ব প্রকাশ করার অধিকার একমাত্র আল্লাহ তায়ালার। একটি হাদিসে কুদসিতে এসেছে, আল্লাহ তায়ালা বড়ত্বকে তাঁর চাদরের সাথে তুলনা করেছেন। সুতরাং আল্লাহর একজন সাধারণ গোলাম বা বান্দা হয়ে আমাদের কোনোভাবেই অহংকার করার অধিকার নেই।
কিন্তু বাস্তব সত্য হলো, এই অহংকারের রোগ আমাদের অন্তর থেকে আপনাআপনি দূর হয়ে যাবে না। শারীরিক রোগের মতোই এই রোগের জন্যও বিশেষ চিকিৎসা, সচেতনতা এবং নিয়মিত প্রচেষ্টার প্রয়োজন।
অহংকার দূর করার ৬টি বাস্তবমুখী পদক্ষেপ
প্রিয় উস্তাদের মজলিস থেকে অহংকার দূর করার অত্যন্ত কার্যকরী ৬টি উপায় নিচে তুলে ধরা হলো, যা আমাদের দৈনন্দিন জীবনে অনুশীলন করা উচিত:
১. নিজের দোষ ও অপরের গুণকে সামনে রাখা: সবসময় নিজের ভেতরের ত্রুটি-বিচ্যুতি এবং অন্যের ভেতরের ভালো গুণগুলোর দিকে নজর দিন। যখন আপনি অন্যের ভালো দিকগুলো দেখবেন, তখন নিজের অজান্তেই অন্তরের মধ্যে বিনয় বা নম্রতা সৃষ্টি হবে এবং অহংকার দূর হয়ে যাবে।
২. নিয়ামতকে আল্লাহর দান হিসেবে দেখা: মানুষের মনে অহংকার সাধারণত আসে আল্লাহর কোনো বিশেষ নিয়ামত পেয়ে। যেমন—কেউ দেখতে সুন্দর, কেউ ধনী, কিংবা কেউ অনেক মেধাবী। এসব কারণে মনে অহংকার দানা বাঁধলে সাথে সাথে এই চিন্তা করা উচিত—”আমি যা নিয়ে অহংকার করছি, তাতো আমার নিজস্ব কোনো যোগ্যতা নয়, বরং আল্লাহর দেওয়া নিয়ামত। আল্লাহ চাইলে মুহূর্তের মধ্যেই এই নিয়ামত আমার থেকে ছিনিয়ে নিতে পারেন।” এই ভাবনা মনের ভেতরের অহংকারকে গুঁড়িয়ে দেবে।
৩. নিজের শুরু ও শেষ পরিণতি নিয়ে ভাবা: নিজের অস্তিত্বের আদি-অন্ত নিয়ে একটু গভীরভাবে চিন্তা করুন। আমার শুরুটা তো হয়েছিল এক ফোঁটা তুচ্ছ নাপাক পানি থেকে, আর আমার শেষ পরিণতিও হবে অন্ধকার মাটির নিচে—যে মাটি সবসময় মানুষের পায়ের নিচে থাকে। তাহলে মাঝখানের এই সামান্য ক’দিনের জীবনে কীসের ভিত্তিতে আমরা এত অহংকার করি?
৪. ছোট ছোট কাজ নিজে করা: কোনো কাজকেই ছোট মনে না করে তা নিজ হাতে করার অভ্যাস করা। যেমন—ঘরের কাজে স্ত্রীকে সহায়তা করা, বাজার বা দোকান থেকে কিছু কেনাকাটা করলে তা অন্যের হাতে না দিয়ে নিজের হাতে বহন করা ইত্যাদি। এগুলো মানুষের আত্মগরিমা কমাতে সাহায্য করে।
৫. তথাকথিত ‘ছোট পেশা’র মানুষকে সম্মান করা: যদিও ইসলামের দৃষ্টিতে কোনো হালাল কাজই ছোট নয় এবং কোনো পেশাকেই ছোট করে দেখার অবকাশ নেই; তবে বর্তমান সমাজ অনেক পেশাকে নিচু চোখে দেখে। অহংকার কমানোর একটি দারুণ উপায় হলো—রিকশাচালক, দিনমজুর বা পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের মতো খেটে খাওয়া মানুষদের প্রতি বিশেষ সম্মান প্রদর্শন করা এবং নিজে এগিয়ে গিয়ে তাদেরকে প্রথমে সালাম দেওয়া।
৬. নিয়ামত পেয়ে বেশি বেশি শুকরিয়া আদায় করা: যখনই আল্লাহ তায়ালা আপনাকে কোনো সাফল্য বা নিয়ামত দেবেন, তখনই বিনয়ের সাথে আল্লাহর শুকরিয়া (আলহামদুলিল্লাহ) আদায় করুন। শুকরিয়া আদায়ের অভ্যাস থাকলে মনে আর কখনোই অহংকার আসার সুযোগ পায় না।
———–
২০১৭ সালের ১৭ই নভেম্বর, রোজ বৃহস্পতিবার মাগরিবের পর এক খাস তরবিয়তি মজলিসে এই মূল্যবান কথাগুলো বলেছিলেন আমার প্রিয় উস্তাদ এবং প্রিয় মানুষ মাওলানা আবু সাবের আব্দুল্লাহ (হাফিযাহুল্লাহ)। তিনি অত্যন্ত সুন্দরভাবে কুরআন ও হাদিসের দলিল উল্লেখ করে কথাগুলো আমাদের বুঝিয়েছিলেন। নিজের আত্মশুদ্ধি এবং কথাগুলো আমল করার সুবিধার্থে নিজের মতো করে সংক্ষেপে লিখে রেখেছিলাম। আশা করি, আমার মতো অন্য যারাও এটি পড়বেন, তাঁরাও অন্তরের এই গোপন ব্যাধি থেকে মুক্ত হতে উপকৃত হবেন। আল্লাহ আমাদের তাওফিক দিন। আমিন।

