যে স্বপ্নের কথা বারবার শোনাই আমার কওমীর ছাত্রদের

কওমী

যারা কখনো কওমী মাদরাসায় পড়েননি, তাদের জন্য আমরা কীভাবে মেহনত করতে পারি? কী কী কাজ করতে পারি তাদের জন্য?

এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খোঁজার আগে আমাদের মূল লক্ষ্যটা বুঝতে হবে।

আমাদের লক্ষ্য কী?

আমাদের লক্ষ্য হল প্রতিটি মুসলমানকে খাঁটি ঈমানদার ও আমলওয়ালা বানানো।

এখন আলহামদুলিল্লাহ যে, আমরা যারা মাদরাসায় পড়েছি, আমাদের চারপাশের পরিবেশটাই এমন যে, পরিবেশের কারণেই বেশিরভাগ ছাত্রের ঈমান ও আমলের অবস্থা খুবই উন্নত হয়। আর এটিই তো কওমি মাদরাসার বৈশিষ্ট্য যে, এখানে শুধু ইলম শিক্ষা দেওয়া হয় না, বরং এর পাশাপাশি সার্বক্ষণিক আমলের পরিবেশও বজায় থাকে।

কিন্তু একটি মুহূর্ত ভাবিযে, আমাদের মাদরাসার বাইরের যে বাড়িঘর বা সমাজ, সেখানকার মানুষেরা কি আমাদের মতো অবস্থায় আছেন? আমরাই কি কেবল দ্বীন জানব, আমল করব আর জান্নাতে যাওয়ার চেষ্টা করব? তাদের জন্য কি আমাদের কোনো দায়িত্ব নেই?

“আমাদের নিজেদের বাড়িতে যদি আগুন লাগে, আমরা কি সেই আগুন নেভানোর চেষ্টা করব না? তাহলে আমাদের এটাও গভীরভাবে ভাবা উচিত যে, সমাজের সাধারণ মানুষকেও ঈমান-আমল শিক্ষা দিতে হবে, যেন তারা জাহান্নামের আগুন থেকে বাঁচতে পারে এবং আমরা সবাই যেন দুনিয়ায় জান্নাতের কাজগুলো করে যেতে পারি।”

এই মেহনতের জন্য প্রথমেই যে কাজটি করতে হবে, সেটি হচ্ছে একটি সময়োপযোগী সিলেবাস তৈরি করা। সিলেবাসটি এমন সংক্ষিপ্ত ও গোছানো হবে, যেন মাত্র ১০০ থেকে ২০০ ঘণ্টা সময় ব্যয় করলেই যেকোনো সাধারণ মানুষের পক্ষে এর সমস্ত পড়া আয়ত্ত করা সম্ভব হয়।

সিলেবাসটিতে মূলত যে বিষয়গুলো থাকবে:

  • ঈমানের মৌলিক আলোচনা: ঈমানের প্রয়োজনীয় সকল বিষয়ে সংক্ষিপ্ত ও স্পষ্ট ধারণা দেওয়া (যেমন: তাওহিদ, রিসালাত, আখিরাত, শিরক, বিদআত ইত্যাদি)।

  • ফরজ আমলের মাসয়ালা: যে কাজগুলো প্রতিটি মুসলমানের ওপর ফরজ (যেমন: নামাজ, রোজা ইত্যাদি), সেগুলোর জন্য প্রয়োজনীয় যাবতীয় মাসায়েল।

  • শুদ্ধ কুরআন তিলাওয়াত: কুরআন মাজিদ বিশুদ্ধভাবে রিডিং পড়ার নিয়ম ও অনুশীলন।

  • মৌলিক জীবনবিধান: হালাল-হারাম সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা, আলেমদের সোহবত (সান্নিধ্য) ও আত্মশুদ্ধির (তাজকিয়া) প্রয়োজনীয়তা।

এই সিলেবাস আমরা কাদের এবং কীভাবে শেখাব?

আমাদের টার্গেট হবে প্রতিটি মুসলমান। একজন মুসলমানও যেন এমন না থাকেন, যিনি এই মৌলিক বিষয়গুলো আয়ত্ত করতে পারেননি। এই ছাত্র সংগ্রহ ও পাঠদানের ব্যবস্থার জন্য ভিন্ন ভিন্ন ৩টি পরিকল্পনা (Plan) বাস্তবায়ন করা যেতে পারে:

১. মাদরাসাকেন্দ্রিক দ্বীনি তালীম ও কোর্স (প্রথম পরিকল্পনা)

কওমি মাদরাসায় একটি আলাদা হলরুম থাকবে, যেটি মাদরাসার নিয়মিত ছাত্র-শিক্ষকদের ব্যবহারের জন্য নয়; বরং সেটি নির্দিষ্ট থাকবে এলাকাবাসীর জন্য।

  • সেখানে সপ্তাহে অন্তত একদিন এলাকাবাসীর জন্য দ্বীনি তালীমের ব্যবস্থা করা হবে।

  • যখন দ্বীনের প্রতি তাদের আগ্রহ সৃষ্টি হবে, তখন তাদেরকে ইলম শেখার প্রতি উদ্বুদ্ধ করে এই সংক্ষিপ্ত সিলেবাসের ওপর কোর্স শুরু করা হবে।

  • যারা প্রতিদিন সময় দিতে পারবেন, তাদের জন্য একরকম কোর্স এবং যারা শুধু শুক্রবারে সময় দিতে পারবেন, তাদের জন্য বিশেষ উইকএন্ড কোর্সের ব্যবস্থা রাখা যেতে পারে।

কোর্সের ফি এবং দ্বিতীয় ধাপ: যেহেতু সম্পূর্ণ ফ্রি জিনিসে মানুষের আগ্রহ কম থাকে, তাই সামান্য কিছু বেতন বা ফি ধার্য করা যেতে পারে। তবে অবশ্যই লক্ষ্য রাখতে হবে যে, টাকার অভাবে কেউ যেন কোর্স থেকে বাদ পড়ে না যান। ইখলাসের সাথে কাজ করতে পারলে আল্লাহ তায়ালাই অর্থের ব্যবস্থা করে দেবেন ইনশাআল্লাহ।

এই কোর্সের প্রথম ব্যাচ শেষ হওয়ার পর শুরু হবে দ্বিতীয় ধাপ—মাদরাসার আশেপাশের বাড়িগুলোতে (উত্তর, দক্ষিণ, পূর্ব, পশ্চিম চারদিকে) খোঁজ নেওয়া। তারা এই মৌলিক বিষয়গুলো জানেন কি না তা যাচাই করা এবং যেকোনো মতাদর্শের মানুষের সাথেই উত্তম ব্যবহার করে তাদের এই কোর্সে আসার আমন্ত্রণ জানানো।

(বিশেষ দ্রষ্টব্য: যারা উচ্চশিক্ষিত এবং যারা প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় শিক্ষিত নন, সম্ভব হলে তাদের জন্য পৃথক ব্যাচের ব্যবস্থা করলে ভালো হবে। কারণ সবার বোঝার ক্ষমতা এক নয়।)

২. স্কুলকেন্দ্রিক দ্বীনি মেহনত (দ্বিতীয় পরিকল্পনা)

আমরা জানি যে, স্কুলগুলোতে ‘ইসলাম শিক্ষা’ নামে একটি বিষয় রয়েছে। এই বিষয়টি যারা পড়ান, সেই শিক্ষকদের সাথে যোগাযোগ করা এবং তাদেরকে এই সংক্ষিপ্ত সিলেবাসের প্রয়োজনীয়তা ও পাঠদান পদ্ধতি বুঝিয়ে বলা। আশা করা যায়, তাদের অনেকেই এই দাওয়াত কবুল করবেন এবং মূল বইয়ের পাশাপাশি আমাদের সিলেবাসের পড়াগুলোও শিক্ষার্থীদের শিখিয়ে দেবেন।

সম্ভাব্য চ্যালেঞ্জ ও সমাধান:

  • যোগ্যতার অভাব: কিছু শিক্ষক হয়তো ধর্মীয় বিষয়ে ততটা পারদর্শী না-ও হতে পারেন। এমন স্কুলের জন্য একদল তরুণ আলেম তৈরি করা, যারা বিশুদ্ধভাষী হবেন এবং কথাবার্তা ও চলায় যথেষ্ট স্মার্ট হবেন। এরপর স্কুল কর্তৃপক্ষের সাথে কথা বলে তাদেরকে সেখানে শিক্ষক হিসেবে নিয়োগের চেষ্টা করা। স্কুলের পক্ষ থেকে বাজেট না থাকলে মাদরাসার ফান্ড থেকে তাদের বেতনের ব্যবস্থা করা যেতে পারে।

  • কর্তৃপক্ষের অনাগ্রহ: ঝামেলার ভয়ে কোনো কোনো স্কুল পরিচালক এই প্রস্তাবে রাজি না-ও হতে পারেন (যদিও এতে রাজনৈতিক কোনো বিষয় থাকবে না)। সেক্ষেত্রে সরাসরি স্কুলের ছাত্রদের টার্গেট করে ব্যাপক প্রচারণা চালাতে হবে এবং তাদেরকে প্রথম পরিকল্পনার আওতায় মাদরাসার হলরুমে এনে আলাদা কোর্সের ব্যবস্থা করতে হবে।

(উল্লেখ্য: যেসব এলাকায় মক্তব ব্যবস্থা সচল আছে এবং বাচ্চারা মক্তবেই এই বিষয়গুলো শেখার সুযোগ পাচ্ছে, সেখানে স্কুলকেন্দ্রিক এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের প্রয়োজন পড়বে না।)

৩. অনলাইনভিত্তিক উন্মুক্ত শিক্ষা (তৃতীয় পরিকল্পনা)

যেহেতু শুরুতেই সব এলাকায় সশরীরে কোর্সটি শুরু করা সম্ভব নয়, তাই প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষ কিংবা সাধ্যমতো চেষ্টা করেও যাদেরকে সরাসরি কোর্সে যুক্ত করা যায়নি, তাদের জন্য সর্বশেষ মাধ্যম হলো অনলাইন।

  • অনলাইনে এই সিলেবাসের ওপর প্রতিটি ক্লাসের ভিডিও রেকর্ডিং থাকবে, যেন যেকোনো মানুষ যেকোনো সময় এর দ্বারা উপকৃত হতে পারেন।

  • একটি ডেডিকেটেড ওয়েবসাইট এবং অ্যাপস (Apps) থাকবে, যেখানে সিলেবাসের বিষয়গুলো সুবিন্যস্তভাবে সাজানো থাকবে।

  • একটি নিয়মতান্ত্রিক গাইডলাইনের মাধ্যমে অনলাইন কোর্স পরিচালিত হবে, যেন নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সিলেবাসটি শেষ করা সম্ভব হয়।

এগুলো মূলত আমার দীর্ঘদিনের স্বপ্ন। এতদিন শুধু ছাত্রদের মুখে মুখে বলতাম, আজ তা কলমের কালিতে লিখলাম। হয়তো এই লেখা থেকে কেউ অনুপ্রেরণা পাবেন এবং এর চেয়েও আরও উত্তম কোনো কর্মপরিকল্পনা সাজাবেন।

আল্লাহ তায়ালা যেন আমাকে এবং আমার মতো কওমির সন্তানদেরকে কওমের কল্যাণে কাজ করার তাওফিক দান করেন। আমিন।

(২৪/৪/২০২১)

error: Content is protected !!