স্বপ্নের কথা

যে স্বপ্নের কথা বারবার শুনাই ছাত্রদের…

যারা কখনো মাদরাসায় পড়েননি, তাদের জন্য আমরা কীভাবে মেহনত করতে পারি?
কী কী কাজ করতে পারি তাদের জন্য?
প্রথমে আমাদের লক্ষ্যটা বুঝতে হবে। আমাদের লক্ষ্য প্রতিটি মুসলমানকে খাঁটি ঈমানদার ও আমলওয়ালা বানানো।
আলহামদুলিল্লাহ, আমরা যারা মাদরাসায় পড়েছি, আমাদের পরিবেশটাই এমন যে, পরিবেশের কারণে আমাদের বেশীরভাগ ছাত্রের ঈমান ও আমলের অবস্থা খুবই উন্নত হয়। আর এটা তো কওমী মাদরাসার বৈশিষ্ট্যই যে, এখানে শুধু ইলম শিক্ষা দেওয়া হয় না, বরং এর পাশাপাশি সার্বক্ষণিক আমলের পরিবেশও এখানে বজায় থাকে। কিন্তু একটা মুহূর্ত ভাবি। এই যে আমাদের মাদরাসার বাহিরে যে বাড়িটা, এই বাড়ির লোকেরা কি আমাদের মতো অবস্থায় আছেন? আমরাই নিজেরাই শুধু জানব, আমল করব, জান্নাতে যাওয়ার চেষ্টা করব? তাদের জন্য কিছু করব না? বাড়িটাতে যদি আগুণ লাগে, আমরা কি চেষ্টা করব না সে আগুণ নিভাতে? তাহলে তো আমাদের এটাও ভাবা উচিৎ যে, তাদেরকে ঈমান-আমল শিক্ষা দিতে হবে। যেন তারা জাহান্নামের আগুণ থেকে বাঁচতে পারে। আমরা সবাই যেন দুনিয়ায় জান্নাতের কাজগুলো করে যেতে পারি।
প্রথমেই যে কাজটি করতে হবে, সেটি হচ্ছে একটি সিলেবাস তৈরি করা। সিলেবাসটি খুবই সংক্ষিপ্ত হবে যেন ১০০ থেকে ২০০ ঘণ্টা সময় ব্যয় করলেই যে কোন মানুষের পক্ষে সিলেবাসের সমস্ত পড়া আয়ত্ব করা সম্ভব হয়।
সিলেবাসটিতে যে বিষয়গুলো থাকবে, সেগুলো হচ্ছেঃ
ঈমানের মৌলিক ও প্রয়োজনীয় সকল বিষয়ে সংক্ষিপ্তভাবে স্পষ্ট ধারণা দেওয়া। (যেমন, তাওহীদ, রিসালাত, আখেরাত, শিরক, বেদাত ইত্যাদি সম্পর্কে ধারণা দেওয়া।)
যে কাজগুলো প্রতিটি মুসলমানের উপর ফরজ যেমন, নামায, রোযা ইত্যাদি, সেগুলোর প্রয়োজনীয় সকল মাসায়েল।
কোরআন তিলাওয়াত বিশুদ্ধ করার উপায়।
হালাল-হারাম সম্পর্কে মৌলিক ধারণা, আলেমদের সোহবত ও তাজকিয়ার প্রয়োজনীয়তা ইত্যাদি।
এখন প্রশ্ন হল, এই সিলেবাসের বিষয়গুলো আমরা কাদেরকে শেখাব? তাদের কোথায় পাব এবং কোথায় পড়ানোর ব্যবস্থা করব?
আবারও মনে করিয়ে দেই, আমরা শেখাব প্রতিটি মুসলমানকে। হ্যাঁ, প্রতিটি মুসলমান। আমাদের টার্গেট হবে এমন যে, একজন মুসলমানও এমন থাকবে না যে এই সিলেবাসের বিষয়গুলো আয়ত্ব করতে পারেনি।
আর ছাত্র সংগ্রহ ও পড়ানোর ব্যবস্থার জন্য ভিন্ন ভিন্ন কয়েকটি প্ল্যান তৈরি করা হবে। আমি আমার নিজস্ব কিছু প্ল্যান তুলে ধরছি। যারা কাজ করবেন, তারা আরও ভালো কিছু প্ল্যান তৈরি করতে পারেন।
প্রথম প্ল্যান হল, কওমী মাদরাসায় একটি আলাদা হলরুম থাকবে যেটি মাদরাসার ছাত্র-শিক্ষকদের ব্যবহারের জন্য নয়। এখানে এলাকাবাসীর জন্য সপ্তাহে একদিন দ্বীনী তালীমের ব্যবস্থা করা হবে। যখন দ্বীনের প্রতি তাদের আগ্রহ সৃষ্টি হবে, তখন তাদেরকে ইলম শেখার প্রতি উদ্বুদ্ধ করা হবে। তাদেরকে নিয়েই সেই হলরুমে শুরু হবে সেই সিলেবাসের উপর কোর্স। যারা প্রতিদিন সময় দিতে পারবেন, তাদের জন্য একরকম কোর্স। যারা শুধু শুক্রবার সময় দিতে পারবেন, তাদের জন্য আরেকরকম কোর্স এভাবে হবে।
যেহেতু ফ্রি জিনিসে মানুষের আগ্রহ থাকে না, তাই বেতন ধার্য করা যেতে পারে। কিন্তু অবশ্যই লক্ষ্য রাখতে হবে যে, টাকার অভাবে কেউ যেন কোর্স থেকে বাদ পড়ে না যান। ইখলাসের সাথে করতে পারলে আল্লাহ্‌ তায়ালাই অর্থের ব্যবস্থা করে দিবেন ইনশাআল্লাহ্‌।
প্রথমে তালীমে যারা এসেছে, তাদের কোর্স শেষ হওয়ার পর শুরু হবে দ্বিতীয় ধাপ। মাদরাসার আশেপাশের বাড়িগুলোতে খোঁজ নেওয়া। উত্তর, দক্ষিণ, পূর্ব, পশ্চিম চারদিকে যে বাড়িগুলো আছে, সেগুলোতে যাওয়া। খোঁজ নেওয়া যে, বাড়ির সমস্ত লোক সিলেবাসের বিষয়গুলো জানেন কি-না। যে মতাদর্শের লোকই হোক না কেন, তার সাথে উত্তম ব্যবহার করা। কোর্সটি করার অনুরোধ জানানো। আর্থিক সামর্থ্য না থাকলেও যে ফ্রিতে কোর্সটি করা যাবে, সেটিও জানানো।
এখানে কোর্স প্রসঙ্গে একটি কথা বলে রাখা দরকার যে, যারা উচ্চশিক্ষিত এবং যারা প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় শিক্ষিত নন, সম্ভব হলে তাদের জন্য পৃথকভাবে কোর্সের ব্যবস্থা করলে ভালো হবে। কারণ, সবার বুঝ ও ধারণ ক্ষমতা এক নয়।
দ্বিতীয় যে প্ল্যান, সেটি হচ্ছে স্কুলকেন্দ্রিক।
আমরা জানি যে, স্কুলে ইসলাম শিক্ষা নামে একটি বিষয় আছে। এই বিষয়টি যারা পড়ান, তাদেরকে দাওয়াত করা। তাদের সিলেবাসের বিষয়গুলো পড়ানোর প্রয়োজনীয়তা ও পাঠদান পদ্ধতি বুঝানো। আশাকরি, তাদের অনেকেই দাওয়াত কবুল করবেন এবং ইসলাম শিক্ষা বইয়ের পাশাপাশি আমাদের সংক্ষিপ্ত সিলেবাসের পড়াগুলো পড়াবেন।
এখানে কিছু সমস্যা দেখা দিতে পারে। কিছু শিক্ষক আমাদের প্রস্তাবে রাজী না হতে পারেন। কিছু শিক্ষক ধর্মীয় বিষয়ে পারদর্শী না-ও হতে পারেন। সিলেবাসের বিষয়গুলো পড়ানোর যোগ্যতা তাদের মাঝে না থাকতে পারেন। এমন স্কুলগুলোর জন্য একদল আলেম তৈরি করা। তারা বিশুদ্ধভাষী হবেন এবং কথাবার্তা ও চলাফেরায় যথেষ্ট স্মার্ট হবেন। তারপর স্কুল পরিচালককে বুঝিয়ে তাদেরকে স্কুলে শিক্ষক হিসেবে নিয়োগদানের চেষ্টা করা। স্কুলের পক্ষ থেকে যদি বেতন নাও দেওয়া হয়, মাদরাসার পক্ষ থেকে তাদের বেতন দানের ব্যবস্থা করা।
তবে স্কুল পরিচালকদের অনেকে এ প্রস্তাবে রাজী না হতে পারেন। যদিও সরকারবিরোধী বা রাজনৈতিক কোন কথাবার্তা সিলেবাসে থাকবে না, কিন্তু ঝামেলার ভয়ে তারা এ প্রস্তাবে রাজী না হতে পারেন। এক্ষেত্রে স্কুলের ছাত্রদের টার্গেট করে ব্যাপক প্রচারণা চালানো এবং তাদেরকে প্রথম প্ল্যানের আওতায় নিয়ে আসা। তাদের জন্য মাদরাসার সেই হলরুমে আলাদাভাবে কোর্সের ব্যবস্থা করা।
এখানে একটা কথা বলে রাখা ভালো যে, অনেক এলাকায় মক্তব চালু আছে। যদি মক্তবে সব বাচ্চারাই পড়ে থাকে এবং মক্তবেই সিলেবাসের বিষয়গুলো জানার সুযোগ থাকে , তাহলে সেই এলাকার জন্য স্কুলের প্ল্যানটি আর বাস্তবায়ন করার প্রয়োজন পড়বে না।
তৃতীয়টি প্ল্যানটি হল অনলাইনে।
যেহেতু শুরুতেই আমরা সব এলাকায় কোর্সটি শুরু করতে পারব না, তাই আমাদের এলাকার বাহিরে যারা আছেন এবং সাধ্যমতো চেষ্টা করেও এলাকার যাদেরকে কোর্সে যুক্ত করা যায়নি, তাদের জন্য সর্বশেষ প্রচেষ্টা হল অনলাইন। অনলাইনে সিলেবাসের উপর ক্লাসগুলোর ভিডিও থাকবে। যেন যে কেউ যেকোনো সময় এর দ্বারা উপকৃত হতে পারেন। থাকবে ওয়েবসাইট এবং এপস। যেখানে সিলেবাসের বিষয়গুলো সুবিন্যস্তভাবে সাজানো থাকবে। এই উম্মুক্ত ক্লাসগুলো ব্যবহার করেই চলবে অনলাইন কোর্স। যেন চাপের মধ্যে থেকে নির্দিষ্ট সময়ে সিলেবাসটি শেষ করা সম্ভব হয়।
এগুলো স্বপ্ন। এতদিন ছাত্রদের বলতাম। আজ লেখলাম। হয়তো কেউ অনুপ্রেরণা পাবেন। আমার মতো বা আমার চেয়ে উত্তম কোন প্ল্যান সাজাবেন।
আল্লাহ্‌ তায়ালা যেন আমাকে এবং আমার মতো কওমির সন্তানদেরকে কওমের জন্য কাজ করার তাওফীক দান করেন।

Facebook Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *