“মেয়েরা কেন ছেলেদের অর্ধেক সম্পদ পাবে?”—প্রশ্নটা বর্তমান সময়ে অনেকের মনেই আসতে পারে। আর মনে এ ধরনের কৌতূহল বা প্রশ্ন জাগাটা কিন্তু মোটেও দোষের কিছু না।
স্বয়ং ইব্রাহীম (আ.) আল্লাহর নবী ছিলেন। তিনি মনে-প্রাণে বিশ্বাস করতেন যে, আল্লাহ তায়ালা মৃত্যুর পর মানুষকে আবার জীবিত করবেন। তবুও তিনি একদিন আল্লাহকে বলেছিলেন:
“হে আমার প্রতিপালক! তুমি কীভাবে মৃতকে জীবিত করো, তা আমাকে একটু দেখাও।” আল্লাহ বললেন, “তুমি কি তবে বিশ্বাস করো না?” তিনি বললেন, “অবশ্যই বিশ্বাস করি, তবে আমি চাই যেন আমার অন্তরটা প্রশান্ত হয়।” (সূরা বাকারা: ২৬০)
এই আয়াত থেকে বোঝা যায়, মনকে শান্ত করার জন্য বা কৌতূহল থেকে কোনো বিষয়ে প্রশ্ন করা বা জানতে চাওয়া ইসলামের দৃষ্টিতে মোটেও অপরাধ নয়। কিন্তু সমস্যাটা অন্য জায়গায়। প্রশ্নটা যখন জানার জন্য না হয়ে, সমাজে বিভ্রান্তি ছড়ানোর উদ্দেশ্যে তোলা হয়—তখন সেটা মারাত্মক রূপ নেয়।
“আলাপ জারি রাখার” পেছনের আসল উদ্দেশ্য
আজকাল কিছু মানুষ ঠিক এই উদ্দেশ্য নিয়েই সমাজে একটা প্রশ্ন বারবার তোলার পাঁয়তারা করছে—”মেয়েরা কেন ছেলেদের অর্ধেক পাবে?”
তাদের মূল দাবি হলো, মেয়েদেরকেও ছেলেদের সমান সম্পদ দিতে হবে। এখন তারা যখন দেখছে যে এই মুহূর্তে দেশের আইন বা বাস্তবতায় এটা চাপিয়ে দেওয়া সম্ভব না, তখন সুর বদলে বলছে, “আমরা আসলে কোনো আইন বদলাতে চাচ্ছি না, আমরা মূলত এই আলাপটা সমাজে জারি রাখতে চাচ্ছি।”
একটু ঠান্ডা মাথায় ভাবুন, এই ‘আলাপ জারি রাখার’ মানে কী? এর মানে হলো, এই প্রশ্নটা যেন মানুষের মনে বারবার ঘুরপাক খায়। মানুষ যেন এটা নিয়ে প্রতিনিয়ত ভাবতে থাকে এবং শেষমেশ একসময় মনে করতে শুরু করে—ইসলামই বুঝি নারী-পুরুষের সমতার পথে সবচেয়ে বড় বাধা!
একজন মুমিনের অবস্থান
অথচ একজন সাধারণ মুসলমানও খুব ভালো করে জানেন যে, মিরাসের (উত্তরাধিকার) এই বিধানটি সরাসরি পবিত্র কুরআনের স্পষ্ট আয়াত দ্বারা নির্ধারিত। আল্লাহ তায়ালা বলেন:
“আল্লাহ তোমাদের সন্তানদের (উত্তরাধিকারের) বিষয়ে নির্দেশ দিচ্ছেন—এক ছেলের অংশ দুই মেয়ের অংশের সমান হবে।” (সূরা আন-নিসা: ১১)
আল্লাহ তায়ালা নিজে যেখানে কোনো নির্দেশ দিয়েছেন, সেখানে একজন সত্যিকারের মুমিনের একটাই জবাব হওয়া উচিত, যা কুরআনে শেখানো হয়েছে:
*”সামি’না ওয়া আত্বা’না”—আমরা শুনলাম এবং মেনে নিলাম। (সূরা বাকারা: ২৮৫)
এখন কেউ যদি এর বিপরীতে গিয়ে বলে, “না, এই নিয়মটা আমার ভালো লাগছে না, আমি এটা মানতে পারি না”—তাহলে সে কিন্তু প্রকারান্তরে সরাসরি কুরআনের আয়াতেই আপত্তি তুলল। আর আল্লাহর দেওয়া বিধানে আপত্তি তোলার পর একজন মানুষের ঈমান কতটুকু অবশিষ্ট থাকে, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।
ইসলাম কেন মেয়েদের অর্ধেক দিল? দুটি সহজ উত্তর
তাত্ত্বিক দীর্ঘ আলোচনায় না গিয়ে খুব সহজ ও যৌক্তিক দুটি পয়েন্টের মাধ্যমে বিষয়টি বোঝা সম্ভব:
১. আর্থিক দায়িত্বের বণ্টন: ইসলাম মেয়েদের ওপর কোনো ধরনের আর্থিক দায়িত্ব চাপায়নি। একজন মেয়ের বিয়ের আগে তার যাবতীয় খরচ বাবার, আর বিয়ের পর তার ভরণপোষণের সম্পূর্ণ দায়িত্ব স্বামীর। অন্যদিকে, একজন ছেলেকে নিজের খরচ চালানোর পাশাপাশি মা-বাবা, স্ত্রী ও সন্তানের যাবতীয় খরচ একা বহন করতে হয়।
২. নেওয়া বনাম দেওয়া: বিয়ের সময় মেয়েরা ‘মোহরানা’ বা কাবিন পায়, আর ছেলেদের সেই মোহরানা দিতে হয়। অর্থাৎ, পারিবারিক জীবনে মেয়েরা শুধু নেয়, আর ছেলেদের দিতে হয়।
এবার আপনারাই বিচার করুন, যার ওপর পুরো পরিবারের দ্বিগুণ বা তিনগুণ খরচের দায়িত্ব চাপানো হয়েছে, তাকে যদি সম্পদে দ্বিগুণ অংশ না দেওয়া হয়, তবে সে সংসার চালাবে কীভাবে? ইসলামের এই ভারসাম্যপূর্ণ নিয়মটি কি আসলেই কোনোভাবে অযৌক্তিক?
তাই যখন কেউ জোর গলায় বলে, “ছেলে-মেয়েকে সমান সম্পদ দিতে হবে”, সে মূলত কুরআনের ইনসাফভিত্তিক বিধানের বিরুদ্ধেই অবস্থান নেয়। আর যারা বলে, “আমরা তো শুধু আলোচনার জন্য বলছি, বাস্তবায়নের জন্য না”—তাদের কথা থেকেই স্পষ্ট হয়ে যায় যে, নারীর সমতা বা অধিকার তাদের আসল উদ্দেশ্য নয়। তাদের মূল উদ্দেশ্য হলো, ইসলামকে কাঠগড়ায় দাঁড় করানো এবং মেয়েদের মনে এই ক্ষোভ তৈরি করা যে—”ধর্মের কারণেই তোমরা বঞ্চিত হচ্ছ।”

