কওমী মাদরাসা
২০১৯ সালের মার্চ মাসে আমি আমার আগের মাদরাসা চাকরীটা ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেই। তখন চিন্তা করেছিলাম যে, এবার বাসার কাছে কোনো কওমী মাদরাসায় পড়াব।
বাসার খুব কাছে একটা কওমী মাদরাসা আছে। বিভিন্ন কারণেই এটাতে আমার পড়ানো হবে না, জানি। এখন কাছাকাছি আর কোন মাদরাসা আছে কিনা?
বিভিন্ন জনের কাছ থেকে জিজ্ঞেস করে এবুং রাস্তায় রাস্তায় হেটে আরও দুই-তিনটা মাদরাসা সম্পর্কে জানতে সক্ষম হলাম। তারপর নেটে সার্চ করলাম। কোন তথ্য তো পেলামই না। উল্টো বিভিন্ন মিডিয়ায় কওমী মাদরাসা সম্পর্কে যে নেতিবাচক প্রচারণা, গুগল সার্চে সেগুলোই দেখতে পেলাম সবার আগে।
এই অবস্থা দেখার পর চিন্তা করতে লাগলাম যে, আমি নাহয় মাদরাসা অঙ্গনের সাথে জড়িত এবং কোনো মাদরাসা সম্পর্কে জানতে চাইলে বিভিন্ন সূত্রে সেটা জানতে সক্ষম হব। কিন্তু সাধারণ মানুষ?
তারা যদি মাদরাসা সম্পর্কে জানতে চান কিংবা নিজের সন্তানকে ভর্তি করানোর জন্য গুগলে কোন মাদরাসা তালাশ করেন, তাহলে কী হবে?
নেতিবাচক সংবাদগুলো পড়ে হয়ত তিনি তার সন্তানকে মাদরাসায় দিবেন না। আর সেটা না হলেও, সহজে কওমী মাদরাসার তথ্য তো তার হাতে পৌছাচ্ছে না এবং আমি যে বিড়ম্বনায় পড়েছি, তার চেয়ে বেশী বিড়ম্বনায় পড়তে হবে তাকে।
এসমস্ত কথা চিন্তা করার পর আমার মনে হল, কওমী মাদরাসা সম্পর্কিত একটি বিশেষায়িত ওয়েবসাইট থাকলে ভালো হত। যেখানে কওমী মাদরাসা সম্পর্কিত ইতিবাচক ও সঠিক সব তথ্য থাকবে এবং কওমী মাদরাসা সম্পর্কিত প্রয়োজনীয় সব তথ্য সেখানে পাওয়া যাবে।
কওমী মাদরাসার আলেম-উলামাদের নিয়ে তৈরি ফেসবুক গ্রুউপ আসহাবে কাহাফে এ নিয়ে স্ট্যাটাস দিলাম। জানতে চাইলাম যে, এরকম কোনো ওয়েবসাইট আছে কিনা? জানলাম নেই।
নেটে মাদরাসার তালিকা প্রকাশে সমস্যা আছে কিনা জানতে চাইলাম।
মন্তব্যের ঘরে প্রায় সবাই বললেন, কোনো সমস্যা নেই। তাই আল্লাহর উপর ভরসা করে নিজেই কাজটা শুরু করার চিন্তা করলাম।
কাজ করার কথা বলা সহজ। কিন্তু করাটা অনেক কঠিন। বিশেষত মাদরাসার তালিকা তৈরিকেই যখন প্রথম কাজ নির্ধারণ করলাম। হেটে সব মাদরাসার নাম সংগ্রহ করা অসম্ভবের মত কাজ। অনেক দিন দোয়া করলাম, আল্লাহ তায়ালা যেন সহজ উপায় মিলিয়ে দেন।
এক পর্যায়ে বেফাকের রেজাল্ট বই পেয়ে গেলাম। সেখানে বেফাক পরীক্ষায় অংশ নেওয়া কওমী মাদরাসাগুলোর তালিকা আছে। মাদরাসাগুলোর তথ্য সংগ্রহের এক বিরাট উৎস আমার হাতে এসে গেল। প্রথমে ভাবলাম, ছবি তুলে ছবিটা নেটে প্রকাশ করি। কিন্তু সেই বইয়ে মাদরাসার নামগুলো এত ছোট ছোট অক্ষরে লেখা যে, ছবি তুলে বা স্ক্যানিং করে নেটে দিলে সেটা পড়তে খুব কষ্ট হবে। তাই আমি নামগুলো টাইপ করা শুরু করি। এত ছোট ছোট অক্ষরে থাকা লেখা দেখে হাজার হাজার মাদরাসা মাদরাসার নাম টাইপ করা যে কত কষ্টের সেটা আমি জানি আর Sumaiya জানে। কারণ, আমি লেখেছি আর সে লেখার সময় আমাকে সাহায্য করেছে।
টাইপিং করার পর দেখা দিল নতুন সমস্যা। বেফাকের তালিকাতে মাদরাসার নাম জেলা ভিত্তিক ভাগ করা ছিল। আর অনেক জেলায় যেহেতু ৫০০-১০০০ হাজারের উপর মাদরাসা, তাই সাধারণ মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়, এত এত মাদরাসা থেকে নিজের কাছের মাদরাসাটি খুঁজে বের করা। তাই আমি মাদরাসার নামগুলোকে থানা ও ইউনিয়ন ভিত্তিক ভাগ করার সিদ্ধান্ত নেই। কিন্তু আবারও সমস্যা দেখা দিল।
অনেক মাদরাসা যে থানার অধীনে লেখা আছে, বাস্তবে সেই থানার আন্ডারে নেই। কারণ, থানার সীমানা শেষ কয়েক বছরে কয়েকবার পরিবর্তন হয়েছে। পুরনো থানা ভেঙ্গে অনেক নতুন থানা গঠন করা হয়েছে। এগুলো বুঝতে গিয়ে মাথা নষ্ট হওয়ার অবস্থা।
যেমন, গাজীপুরের কথা বলি। গাজীপুরে কয়টি থানা আছে? সরকারী ওয়েবসাইটে লেখা সাতটি। মাদরাসার নামের তালিকাতেও থানার নামের জায়গায় সেই সাত থানার নামই পাওয়া যায়। যার মধ্যে কাশিমপুর, গাছা ইত্যাদি এলাকাকে দেখানো হয়েছে যে, এগুলো জয়দেবপুর থানার আন্ডারে। অথচ পেপার-পত্রিকা পড়ে আমি জানি, কাশিমপুর গাজীপুর এলাকার স্বতন্ত্র থানা। অনেক খোঁজাখুঁজির পর জানলাম, জয়দেবপুর থানাকে সাত ভাগে ভাগ করা হয়েছে ২০১৮ সালে। এখন এই থানাগুলোর সীমানা আমাকে জানতে হবে, ওয়ার্ডের নাম, মহল্লার নাম জানতে হবে। এখন এগুলো জানার কোন পথ না পাওয়ায় অনেক দিন কাজ বন্ধ করে বসে রইলাম। পরে চিন্তা করলাম, থানার বিষয় যেহেতু, নেট থেকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপন চেক করা যাক। পরে অনেকগুলো প্রজ্ঞাপনের পর গাজীপুরের থানা এলাকার বর্ণনা দেওয়া প্রজ্ঞাপনগুলো খুঁজে পাই। তারপর আমি সেই প্রজ্ঞাপন ও মাদরাসার টাইপিং করা নামগুলো সমন্বয় করে মাদরাসাগুলোর নামের তালিকা প্রকাশ করি।
অনেক সময় এলাকার সীমানা বুঝতে আমি স্থানীয় মানুষদের সাহায্য নিয়েছি। যেমন, নারায়ণগঞ্জ সদর এলাকার জন্য Md. Ashad Ull Haque এর সাথে যোগাযোগ করেছি। বগুড়ার অধিকাংশ মাদরাসা বেফাকের বাহিরে। সেগুলোর তালিকা পাওয়ার জন্য অনেকের সাথে যোগাযোগ করেছি। অবশেষে মাওলানা সালাহুদ্দীন মাসউদ ভাই সাহায্য করেছেন। এভাবে এত কষ্ট করছি যে কল্পনাও করতে পারবেন না।
আর আমি এই কষ্টগুলো করছি কেন? করছি যেন মানুষ এর দ্বারা উপকৃত হয়।
এখন আমার ওয়েবসাইটে এসে মানুষ মাত্র দুই তিন মিনিটে তার থানা বা ইউনিয়নের মাদরাসাগুলোর নাম জানতে পারছে। উপকৃত হচ্ছে। আমার কাজ দ্বারা মানুষ উপকৃত হচ্ছে, এর চেয়ে আনন্দের আর কী আছে? হ্যা এর জন্য আমার সময়-শ্রম যাচ্ছে। প্রচণ্ড অভাবের সময়ও আমি ধার করে ওয়েবসাইটের ডোমেইন হোস্টিং ফি পরিশোধ করেছি। প্রতিদিন প্রায় ৩০ জন করে মানুষ গুগলের মাধ্যমে আমার ওয়েবসাইটে আসছে, উপকৃত হচ্ছে। এটাই আমার আনন্দ, যা আমি অনুভব করতে পারি। ব্যাখ্যা করা সম্ভব না।

Facebook Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *